সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নারী কতটা নিরাপদ?

রহিম সৈকত ◾
স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট সহজলভ্য হওয়ায় আমাদের দৈনন্দিন কাজের বড় একটি অংশ এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সম্পন্ন হয়। কিন্তু এই প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পাশাপাশি নারীদের জন্য সাইবার জগতে নিত্যনতুন ঝুঁকি ও হয়রানি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। অনলাইনে নারীদের প্রতি সহিংসতা শুধু তাদের মানসিক ও সামাজিক জীবনকে ব্যাহত করছে না, বরং তাদের নিরাপত্তা ও স্বাধীন চলাচলের পথেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পরিসংখ্যান বলছে, অনলাইনে নারীরা পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি হয়রানির শিকার হন। একশনএইড বাংলাদেশের তথ্যমতে, ৬৪ শতাংশ নারী তাদের জীবনের কোনো না কোনো সময় অনলাইনে হয়রানির মুখোমুখি হয়েছেন, যা আগের বছরের তুলনায় ১৪ শতাংশ বেশি। প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের আরেকটি জরিপে দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারী ৯১ শতাংশ নারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেকে অনিরাপদ মনে করেন এবং ৫৩ শতাংশ নারী হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছেন। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণীরা; এ বয়সীদের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ এই সহিংসতার শিকার। এমনকি ১৮ বছরের কম বয়সী কিশোরীরাও এর বাইরে নন।

অনলাইনে নারীদের প্রতি সহিংসতা বিভিন্ন ধরনের হয়রানির মাধ্যমে ঘটছে। এর মধ্যে রয়েছে অশ্লীল মন্তব্য, ইনবক্সে অনৈতিক প্রস্তাব, ভুয়া আইডি তৈরি করে ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার, সাইবার স্টকিং, ব্ল্যাকমেইল এবং ডিজিটাল ইভ টিজিং। এসব হয়রানির প্রভাবে নারীরা অনলাইনে সক্রিয় থাকতে অনাগ্রহী হয়ে পড়েন, মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং অনেক ক্ষেত্রে চাকরি ছাড়তে বা চলাফেরা সীমিত করতে বাধ্য হন।

এই সহিংসতা বেড়ে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা, ছদ্মনামের আড়ালে অপরাধ করার সুযোগ, আইন প্রয়োগের দুর্বলতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর অপর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা এসবের মধ্যে অন্যতম। অনেক ভুক্তভোগী জানেন না কোথায় অভিযোগ জানাতে হবে, ফলে অপরাধীরা বারবার পার পেয়ে যায়।

এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সম্মিলিতভাবে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল সাক্ষরতা নিয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। আইন ও সেবা ব্যবস্থাকে সহজলভ্য করে তুলতে হবে, যাতে ভুক্তভোগীরা দ্রুত ও কার্যকরভাবে সহায়তা পান। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোকেও ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও সক্রিয় ও দায়িত্বশীল হতে হবে। 

পাশাপাশি কিছু সংস্থা ও রাষ্ট্রীয় উইং সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করছে। জরুরী পরিস্থিতিতে তাঁদের সহযোগিতা গ্রহনের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে । পুলিশের পক্ষ থেকে সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন (পিসিএসডব্লিউ) ফেসবুক পেজ আছে। এই ফেসবুক পেজে (পুলিশের ফেসবুক পেইজ লিংক) গিয়ে মেসেঞ্জারে অভিযোগ জানানো যাবে। হটলাইন ০১৩২০০০০৮৮৮, ইমেইল সাইবার সাপোর্ট ইমেইল
নারী নির্যাতন প্রতিরোধে পুলিশ সদর দপ্তরের হটলাইন নম্বর ০১৩২০০০২০০১, ০১৩২০০০২০০২ ও ০১৩২০০০২২২২।সিআইডি সাইবার ক্রাইম সেন্টার হেল্পলাইন নম্বর ০১৩২০০১০১৪৮। ডিএমপি সাইবার ক্রাইম হটলাইন নম্বর ০১৩২০০৪৬৬০০। জাতীয় হেল্পলাইন (নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে) ১০৯। ন্যাশনাল লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস অর্গানাইজেশন (NLASO) ১৬৪৩০। চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮। সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশন ০১৯৫৭৬১৬২৬৩।

নারীদের অনলাইনে নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে টেকসই ও সমান ডিজিটাল অগ্রযাত্রা সম্ভব নয়। তাই অনলাইন জগতে নারীদের জন্য নিরাপদ, সম্মানজনক ও স্বাধীন পরিবেশ গড়ে তোলা সময়ের দাবি।

( দৈনিক পূর্বকোণে ৪ আগস্ট, ২০২৫ তারিখে প্রকাশিত)

লেখক : শিক্ষক ও সাংবাদিক

Popular posts from this blog

Biography of Rahim Saikat